অবরুদ্ধ হরমুজ: ট্রাম্পের অবরোধ ভাঙতে নামবে চীনের ভয়ঙ্কর নৌবহর?

১৫ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৩৯:০২

এবার হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ঘিরে নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি। ইরানকে চাপে রাখতে নেয়া এই পদক্ষেপ এখন সরাসরি চীনের জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব ফেলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় কি এবার হরমুজে নৌবহর নামাবে বেইজিং? বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান থেকে সরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিতে পারে।

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সামরিক উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সহজেই ইরানের ওপর হামলা চালাতে পেরেছিল। তবে পরিস্থিতি এখন ধীরে ধীরে চীনকেও টেনে আনছে এই সংঘাতে। এর কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তেহরানকে লক্ষ্য করে করা হলেও এটি চীনের বিরুদ্ধেও প্রভাব ফেলছে। কারণ বেইজিংয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়েই আসে। আর এমন অবস্থায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্যতম কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে চীন। ওই সতর্কবার্তায় এশীয় পরাশক্তি এই দেশটি ট্রাম্পকে বেইজিংয়ের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছে। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি সরাসরি সংঘাতের দিকেই গড়াতে পারে।

ইন্ডিয়া টুডে বলছে, মঙ্গলবার চীনা মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পেরোতে না পেরে ইরানের বন্দরে ফিরে যায়। পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ আরোপ করেন। এর লক্ষ্য ইরানের তেল আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ করা। তবে এতে চীনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ তারা ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল কিনে থাকে। আর এখানেই উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কানাডীয় ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক দিমিত্রি লাসকারিস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আগে চীনের ভেনেজুয়েলার তেলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। এখন ইরানের তেলের ক্ষেত্রেও একই চেষ্টা করছে। এটি শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়, চীনের বিরুদ্ধেও উত্তেজনা বাড়ানোর পদক্ষেপ।’

উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর চীনের নির্ভরতা এতটাই বেশি যে সরবরাহে ধাক্কা লাগলে তাদের অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমন অবস্থায় মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করে এবং এই অবরোধ ‘সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলবে’ বলে সতর্ক করে। ফলে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী কোনো চীনা-সম্পর্কিত তেলবাহী জাহাজ থামানোর চেষ্টা করে বা নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, তাহলে তা সরাসরি উত্তেজনাপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং চীনকে তাদের নৌবাহিনী (পিএলএ নেভি) মোতায়েন করতে বাধ্য করতে পারে।

সি ওয়াই সার্জি-প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঝাং লুন সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে চীনকে সরাসরি মঞ্চে নিয়ে আসা, যাতে তারা ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে।’ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনা জাহাজগুলো নীরবে এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছে জিবুতিতে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে পরিচালিত জাহাজগুলো উপসাগরের দিকে আরও এগিয়ে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে চীন ওমান উপসাগরের কাছে তাদের একটি শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করে। সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য সেখানে ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাতের মধ্যে ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কয়েকটি চীনা কার্গো বিমান তেহরানে অবতরণ করে। মার্কিন আইনজীবী ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক গর্ডন চ্যাং বলেন, ‘এ ধরনের কার্গো বিমান সাধারণত সামরিক সরঞ্জাম বহন করে। এই যুদ্ধে চীন প্রায় নিশ্চিতভাবেই ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করছে।’ এছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী চীন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যদিও চীন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন— তেহরানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠালে বেইজিংয়ের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মারিও নওফাল বলেন, ‘শুরুতে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরানের সংঘাত। এখন ধীরে ধীরে এটি যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিক।’ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে চীনের সামনে কী কী বিকল্প আছে— এ নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নিথানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তার মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপ হবে সমুদ্রপথে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনীর অধিকারী চীন উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে পারে। গত এক দশকে চীনের নৌ এসকর্ট টাস্কফোর্স গালফ অব এডেন এলাকায় নিয়মিত মোতায়েন রয়েছে। ফলে এই ধরনের পদক্ষেপ তাদের জন্য নতুন কিছু হবে না। মূলত চীনের নৌ এসকর্ট টাস্কফোর্সে সাধারণত দুটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি সরবরাহ জাহাজ যুক্ত থাকে।

আর তেমনটা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দেবে যে চীন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া যুদ্ধজাহাজের সংখ্যায়ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। চীনের কাছে যুদ্ধজাহাজ রয়েছে ২৩৪টি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে ২১৯টি। তবে চীনের কার্যকর বিমানবাহী রণতরী মাত্র দুটি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১১টি এবং চীনের হাতে সাবমেরিনের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, চীনের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার অভাব। তাদের সর্বশেষ বড় সংঘাত ছিল ১৯৭৯ সালের চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধ। তবে উন্নিথান বলেন, চীনের বিকল্প শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরও আক্রমণাত্মক পরিস্থিতিতে চীন তাইওয়ান প্রণালির মতো সংবেদনশীল জলপথে যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদের জাহাজ চলাচলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত চলাচল করে। আর তা চীনকে ক্ষুব্ধও করে। তবে এমন পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

তৃতীয়ত, বেইজিং কূটনৈতিক চাপ হিসেবেও পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন আগামী মাসে শি জিনপিং ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠক পিছিয়ে দেয়া। বর্তমানে চীন সরাসরি কোনও সংঘাতমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। শুরুতে অনাগ্রহী থাকলেও শেষ মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করে ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর মাধ্যমে তারা এই সংঘাতে যুক্ত হয়। মূলত এক মাসের যুদ্ধে চীন তেমন উদ্বিগ্ন হয়নি, কারণ স্বল্পমেয়াদে তাদের কাছে পর্যাপ্ত ইরানি তেলের মজুত রয়েছে। তবে হরমুজে ট্রাম্পের নৌ অবরোধ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। কারণ চীনের বড় অংশের তেল ও গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়েই আসে। ফলে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হরমুজে নেয়া প্রতিটি পদক্ষেপ এখন চীনকেও জড়িয়ে ফেলছে। যা শেষ পর্যন্ত নিজেদের জ্বালানি স্বার্থ রক্ষায় সরাসরি সংঘাতে নামতে বাধ্য করতে পারে চীনকে।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য