যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ অবরোধ তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৩:৩৯:১৮

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পরিকল্পনার জবাবে ইরান লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও বন্ধ করে দিতে পারে— এমন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বাড়ার আগেই হরমুজে অবরোধ তুলে নিয়ে আলোচনায় ফেরার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য যেন আরও বড় ঝুঁকিতে না পড়ে তা নিশ্চিত করতেই এই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সৌদি।

প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দর অবরোধের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর দীর্ঘদিনের স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র সৌদি আরব আশঙ্কা করছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বন্দর অবরোধের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ট্রাম্প প্রশাসনকে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তুলে নিয়ে আবার আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের বন্দর অবরোধ করলে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য নৌপথেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা। তবে সৌদি আরব সতর্ক করে দিয়েছে, এর জবাবে ইরান বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এটি লোহিত সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং সৌদি আরবের বাকি তেল রপ্তানির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মূলত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে তেহরান দেখিয়েছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করতে এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোয় হামলা চালাতে সক্ষম ও প্রস্তুত। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোর ঝুঁকির হিসাব বদলে গেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল হুমকির মুখে পড়েছে।

যুদ্ধের মাঝেও সৌদি আরব মরুভূমি পেরিয়ে লোহিত সাগরে তেল পাঠিয়ে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। তবে হরমুজে অবরোধ চলতে থাকায় তারা বিকল্প পথে নির্ভর করছে। রিয়াদের আশঙ্কা, বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ হয়ে গেলে এই রপ্তানিও ঝুঁকিতে পড়বে।

এই প্রণালির আশপাশের উপকূলীয় এলাকা ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গাজা যুদ্ধ চলাকালে হুথিরা এই নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। এখন ইরান তাদের আবারও প্রণালি বন্ধের জন্য চাপ দিচ্ছে বলে আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন বলেন, ‘ইরান যদি বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে চায়, তাহলে হুথিরাই সবচেয়ে উপযুক্ত অংশীদার। গাজা যুদ্ধের সময় তারা যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা এই কাজের জন্য যথেষ্ট।’

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ করলে দেশটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথও বন্ধ করে দিতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা আলি আকবর ভেলায়াতি গত ৫ এপ্রিল সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, তেহরান বাব আল-মান্দেবকে ‘হরমুজের মতোই’ গুরুত্ব দিয়ে দেখে। তিনি বলেন, ‘হোয়াইট হাউস যদি একই ভুল আবার করে, তাহলে খুব দ্রুত বুঝতে পারবে— এক ইশারাতেই বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহ ব্যাহত করা সম্ভব।’

এদিকে সোমবার ইরান আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের নৌপথে বাধা দিলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সমুদ্র নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়বে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি নিউজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানায়, ‘পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ইরানের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা হুমকিতে পড়লে, এই অঞ্চলের কোনও বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।’

এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করে তুলেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের আপত্তি দেখাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। আর এর মধ্যে সোমবার থেকেই ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এ বিষয়ে উপসাগরীয় মিত্ররা তাদের সঙ্গে আছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে তিনি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা রাখতে চান, যাতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। আমরা আমাদের উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।’

এই যুদ্ধ ইরান ও তার আঞ্চলিক প্রতিবেশী যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও ইরাকের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা সামনে এনে দিয়েছে। এতদিন তারা সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে একটি নীরব সমঝোতায় ছিল, কারণ যুদ্ধ তাদের সবার অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর।

তবে এখন সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। আর তেহরানের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না, যুদ্ধ এমনভাবে শেষ হোক যাতে ইরান তাদের অর্থনীতির প্রধান লাইফলাইন এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। তবে সৌদি আরবসহ অনেক দেশই চায়, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক এবং তারা নতুন করে আলোচনা শুরু করার চেষ্টা করছে।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।