প্রতিদিন ১০০ কোটি ডলারের ইরান যুদ্ধ এখন ট্রাম্পের গলার কাঁটা: দ্য টেলিগ্রাফ
এবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর। প্রতিদিন বিপুল সামরিক ব্যয়, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি এবং জনমতের বিরূপ প্রতিক্রিয়া— সব মিলিয়ে যুদ্ধটি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, ভার্জিনিয়ার আরলিংটনের উপকণ্ঠে লিবার্টি গ্যাস স্টেশনে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। স্টেশনের কাউন্টারের পেছনে বসে থাকা পাম্প কর্মী ৫৬ বছর বয়সী ইয়াম সিতৌলা বলেন, ‘আজ ১০ সেন্ট বেড়েছে, গতকালও ১০ সেন্ট বেড়েছিল’। হোয়াইট হাউস থেকে কয়েক মাইল পশ্চিমে অবস্থিত এই স্টেশনে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সিতৌলার বস ফোন করে বাইরে থাকা বড় সাইনবোর্ডে জ্বালানির দাম হালনাগাদ করতে বলছেন। সিতৌলা বলেন, ‘অনেক গ্রাহক জিজ্ঞেস করছেন কেন দাম বাড়ছে। আমার বস মনে করেন, আগামী এক সপ্তাহে আরও ১.৫০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।’
গ্যাস স্টেশনে এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিকে অনেকেই বলছেন ‘জাম্প অ্যাট দ্য পাম্পস’, যা সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত সোমবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস অতি গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে ‘বন্ধ’ ঘোষণা করে। এতইসঙ্গে তারা সতর্ক করেছে যে কোনও জাহাজ এই পথ দিয়ে যেতে চাইলে তা ‘আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হবে’। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক মোতায়েন করার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোট ব্যয় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল ব্যয় এখন ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করছে। তারা আগে থেকেই ট্রাম্পের ঐতিহ্যগত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি থেকে সরে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন।
জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধ সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও খুব জনপ্রিয় নয়, বিশেষ করে এমন এক বছরে তো নয়ই যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন তিনি। এছাড়া বিশ্ববাজারও হোয়াইট হাউসের ওপর চাপ তৈরি করছে। সপ্তাহান্তে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় প্রথমবারের মতো হামলা হওয়ায় তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ক্যাপিটল হিলের এক্সন গ্যাস স্টেশনের ভেতরে কাউন্টারে থাকা ম্যানেজার প্রস্তুত করা একটি বক্তব্য পড়ে শোনাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে খুচরা জ্বালানির দামেও।’
মনে হচ্ছিল, তিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে একই বক্তব্য পড়ে যাচ্ছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রে বহু দশক ধরেই প্রেসিডেন্টরা জ্বালানির দামকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। অনেকেই মনে করেন, এটি পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। প্লাইমাউথ ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি এন্টারপ্রাইজের ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড স্টার্ন বলেন, ‘বারাক ওবামা একবার বলেছিলেন, তার জরিপের ফলাফল কেমন হবে— তা বোঝার সবচেয়ে বড় সূচক ছিল গ্যাসের দাম’। তিনি বলেন, ‘বাস্তবতাও তাই। প্রতিদিনের জনমত অনেক সময় গ্যাসের দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করে। তাই হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই উদ্বিগ্ন।’ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের মধ্যেও ফিসফাস শোনা যাচ্ছে যে ট্রাম্প বিদেশনীতি নিয়ে এত ব্যস্ত যে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ কমে যাচ্ছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তার দ্বিতীয় মেয়াদ তদন্ত, সম্ভাব্য অভিশংসন ও আইন প্রণয়নে অচলাবস্থার মধ্যে পড়তে পারে। হোয়াইট হাউস ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিকান সূত্র পলিটিকোকে বলেন, ‘ইরানিদের ওপর হামলায় আমার সমস্যা নেই। কিন্তু যুদ্ধ মানে সময়ের ৭৫ শতাংশ সেখানেই চলে যায়, এটা একটা সমস্যা।’
Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
