কাতারে হামলার পর এলএনজি উৎপাদন বন্ধ, সবচেয়ে বেশি চাপে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান

৩ মার্চ ২০২৬, ২:৩৮:৫৮

এবার ড্রোন হামলার পর বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি উৎপাদক কাতারএনার্জি তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। আর এর জেরে ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এছাড়া এলএনজি উৎপাদন স্থগিতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে এশিয়ার বাজারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এই তিন দেশ সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দামের চাপ সরাসরি অনুভব করতে পারে। মূলত কাতার বিশ্ববাজারে বড় জোগানদাতা হওয়ায় উৎপাদন কমে গেলে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এলএনজির দামও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হবে।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ড্রোন হামলার পর বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি উৎপাদক কাতারএনার্জি উৎপাদন স্থগিত করায় বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সোমবার (২ মার্চ) কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানি ড্রোন দুটি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এর একটি মেসাইয়িদ শিল্পনগরের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংক এবং অন্যটি রাস লাফানে কাতারএনার্জির একটি জ্বালানি স্থাপনায়। হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে এলএনজি ও অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস লাফান কমপ্লেক্সে রপ্তানির জন্য এলএনজি প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে বলে রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ জানিয়েছে। অর্থাৎ অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে তারা চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়ছে, আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রও উড়ছে। এতে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি বহনকারী জাহাজসহ অন্তত ১৫০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি ও আশপাশে নোঙর করে আছে। সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানায়, তেল ও এলএনজি পরিবহন ৮৬ শতাংশ কমেছে এবং প্রায় ৭০০ জাহাজ প্রণালির দুই পাশে আটকে আছে। কাতারের এলএনজি রপ্তানি বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয়। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো রেচেল জিয়েম্বা বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এশিয়ার বাজার, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে চীন শীর্ষে থাকলেও তাদের ৩৪ শতাংশ গ্যাস আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ফুয়েলস অব দ্য ফিউচারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম্যাকসিম সোনিন বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে, তবে এখনই একে ‘সংকট’ বলা ঠিক হবে না। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, কাতার বা অন্য কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বল্পমেয়াদে বাজারে ওঠানামা বাড়বে। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপে যে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছিল, তা পুনরাবৃত্তি হবে বলে তিনি মনে করেন না।

২০২২ সালের আগে রাশিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক। ইউক্রেন যুদ্ধের পর তাদের রপ্তানি কমে যায়। বর্তমানে শীর্ষ রপ্তানিকারক যুক্তরাষ্ট্র, এরপর কাতার ও অস্ট্রেলিয়া। এদিকে কাতারএনার্জির বিক্রির ৮২ শতাংশ এশিয়ায় গেলেও উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারেও চাপ বাড়ছে। সরবরাহ কমে গেলেও চাহিদা একই থাকায় দাম বেড়েছে। এছাড়া উৎপাদন বন্ধের ঘোষণার পর সোমবার ডাচ ও ব্রিটিশ পাইকারি গ্যাসের মানদণ্ডমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই দিনে এশিয়ার মানদণ্ড এলএনজির দাম প্রায় ৩৯ শতাংশ লাফিয়ে ওঠে। রেচেল জিয়েম্বা বলেন, কাতার দীর্ঘ সময় উৎপাদনের বাইরে থাকলে তা ভালো হবে না। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপে শীতের সবচেয়ে কঠিন সময়টি অন্তত পেরিয়ে গেছে। রয়টার্স বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতের প্রভাব মূল্যায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস সমন্বয় গ্রুপ বুধবার বৈঠক করবে। ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই গ্রুপ গ্যাস মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সংকটে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।