গণভোটে ‘না’ ভোটে সিল মারুন: জিএম কাদের

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:৫১:৪৭

গণভোটে ‘না’ ব্যালটে সিল মারতে দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। সোমবার মধ্যরাত (রাত ১ টার দিকে) এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ আহ্বান জানান। ভিডিও বার্তায় জিএম কাদের বলেন, আমি আজ আপনাদের সামনে এক চরম সংকটে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে সংবিধান নিয়ে সুপরিকল্পিত প্রতারণা, অন্যদিকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বন্ধন ছিঁড়ে যাওয়ার এক ভয়াবহ দৃশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, প্রথমত, আসন্ন গণভোট নিয়ে আমার স্পষ্ট বার্তা—আপনাদের ‘না’ ভোট দিতে হবে। বিভ্রান্তিকর ৪টি বিবৃতির আড়ালে সংবিধানের ৩৮টি পরিবর্তন লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করি, এতে করে দেশে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যহত হবে ও দেশ ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে।

কাদের বলেন, এখানে একটা কথা আমি দৃঢ় কন্ঠে বলতে চাই, তাহলো আমি ব্যক্তিগত ভাবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম। তাছাড়া দলগত ভাবে জাতীয় পার্টি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহন করেছে। শুধুমাত্র রংপুর শহরে আমাদের দুজন কর্মী শহীদ হয়েছে (মিরাজুল ও মানিক)। ৪ জন কর্মী কারাবরন করেছে ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে (আরিফ, ইউসুফ, সজল ও জসিম)। অন্যান্য শতাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়েছে। সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ ভ্রাতা জিএম কাদের বলেন, জুলাই আন্দোলনে নির্যাতিত ও শহীদ নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নে ও তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরাও অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ও সংবিধানের সংস্কারের প্রয়োজন এই বিষয়েও আমাদের কোন দ্বিমত নেই। তবে, আমরা বিশ্বাস করি এ সমস্ত কিছু হতে হবে, সংবিধান সম্মত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। নির্বাচিত সংসদ, সরকার ও জনগনের সম্মিলিত উদ্যোগে।

জাপা চেয়ারম্যান বলেন, কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে শুধু তাদের পূর্ব নির্ধারিত এজেন্টা বাস্তবায়নের জন্য, অস্বচ্ছ ও বেআইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের পক্ষে সৃষ্ট আবেগকে কাজে লাগিয়ে, যে ধরনের সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে ,তা আমাদের কাছে গ্রহনযোগ্য নয়। বর্তমান হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে,সে রকম একটি উদ্যোগ আমরা লক্ষ্য করছি। সে কারনে, গণভোটে জনগনকে “না” ভোট দেয়ার আহবান জানাচ্ছি।

জিএম কাদের বলেন, আজ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। বিদ্বেষ আর বিভাজন আজ ১৮ কোটি মানুষকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইনসাফ আর সাম্যের কথা বলে আজ তৈরি করা হয়েছে চরম বৈষম্য আর দখলদারিত্বের এক অমানবিক রাষ্ট্র। যেখানে চরম নিষ্ঠুরতাকে অভিবাদন জানানো হয়, মন্দির-গির্জা কিংবা মাজারে পৈশাচিক উল্লাস হয়, যেখানে মানুষ আজ বাকরুদ্ধ। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ যেন এক মৃত্যুপুরী। দিনেদুপুরে প্রতিপক্ষকে খুন করে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে| বিভিন্ন স্থানে সংখ্যা লঘুদের বাড়ী ঘর, দোকান লুটপাট, ভাঙ্গচুর ও আগুন দেয়ার অভিযোগ পাওয়ার যাচ্ছে অথচ রাষ্ট্র নির্বিকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে বাড়িঘর ভাংচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কারো ঘুম ভাঙছে না। এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পূর্বলক্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতি ও আজ হুমকির মুখে। বিগত কয়েক মাসে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। ব্যাংকের রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থা আমাদের অজানা। আমাদের সীমান্ত আজ অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। নারীরা ও আজ নিজ দেশে পরবাসী। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি, জারি-সারি-ভাওয়াইয়া আর কবিতার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। এমনকি নারীর শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে চলাফেরাও আজ শকুনের নখরে বন্দি।

এই ধ্বংসাত্মক ডিজাইন আমাদের ভাঙতে হবে। আমাদের প্রথম কাজ হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ছিঁড়ে যাওয়া সকল বন্ধনকে আবার জোড়া দেওয়া। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে: একজন নারীকে তার পোশাকের জন্য হেনস্তা হতে হবে না। শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে প্রহৃত হবেন না। বাউল, শিল্পী বা ভিন্নমতের কোনো মানুষের টুটি চেপে ধরা হবে না। প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। জাপা চেয়ারম্যান বলেন, প্রিয় দেশবাসী, এই নির্বাচনে মাত্র দুটি পক্ষ। একটি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৭১-এর পক্ষের শক্তি, অন্যটি সেই আদর্শবিরোধী অপশক্তি। জাতীয় পার্টি সবসময় আপনাদের পাশে ছিল এবং আছে। জাতীয় পার্টিকে ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে ভোট দেওয়া মানেই হলো একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনা এবং ১৯৭১-এর চেতনাকে জয়যুক্ত করা।

কাদের আরও বলেন, পরিশেষে আমি বলতে চাই, আজ আমাদের দেশ সার্বিকভাবে বিভক্ত। “আমরা এবং তারা” (We and They)—এই বিভাজন আমাদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে কেউ অন্যকে সহ্য করতে পারছি না, অন্যের মতামত বুঝতেও চাইছি না। কিন্তু এই অসহিষ্ণুতা থেকে আমাদের বের হতে হবে। মনে রাখবেন, দেশটা আমাদের সবার। দেশ একটাই এবং দেশের প্রশ্নে আমাদের সবাইকে একমতাবলম্বী ও একতাবদ্ধ হতে হবে। দেশের স্বার্থে কোনো পক্ষ-বিপক্ষ থাকতে পারে না। অতীতের সব তিক্ততা পেছনে ফেলে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বিভাজনের এই অপরাজনীতি এখনই বন্ধ করার সময়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ কিংবা পাহাড়ি-সমতলবাসী—আমাদের সবার পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা বাংলাদেশী।

জিএম কাদের বলেন, আমাদের লক্ষ্য এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে সবাই নিরাপদ থাকবে এবং সবার সমান অধিকার থাকবে। রাষ্ট্র হবে এমন, যেখানে প্রতিটি মানুষ সমানভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার পাবে। আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলি। আসুন, এই মুমূর্ষু দেশকে বাঁচাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। তিনি বলেন, সব শেষে বলতে চাই, অরাজকতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে এবং দেশের গণতন্ত্র রক্ষা করতে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিন।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।