জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় সরকারের অংশ হবে না: মির্জা ফখরুল
এবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শেখ হাসিনা-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনের আগে দলটির ভবিষ্যৎ কৌশল, জোট রাজনীতি, সংস্কার এজেন্ডা ও প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভারতের ইংরেজি ম্যাগাজিন দ্য উইক–কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নির্বাচন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কার এবং আঞ্চলিক কূটনীতি—সবকিছুতেই দলের দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা তুলে ধরেছেন বিএনপি মহাসচিব। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ নিচে দেওয়া হলো:
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ভোট নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে নাগরিকরা কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী একটি পুরো প্রজন্ম রয়েছে, যারা কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা পায়নি। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমি মনে করি, ভোটার উপস্থিতি ভালো হবে। বড় কোনো অস্থিরতা বা গুরুতর বাধা হবে বলে আমি মনে করি না, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে এবং সরকারও নির্বাচন আয়োজনে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে। আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিছু সমস্যা থাকেই, তবে সেগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত করতে মারাত্মক বাধ হবে না। রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
জাতীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে নির্বাচনের আগে বা পরে জোট নিয়ে জল্পনা চলছে? গত ১৫ বছরে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় আমরা বাম ও ডান-উভয় ধারার বহু সমমনা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছিলাম। মোট ২০–২৪টি রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সেই আন্দোলনে একসঙ্গে ছিল। আমরা যখন ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করি, তখন স্পষ্টভাবে বলেছিলাম—সরকার গঠন করলে তা হবে ঐকমত্যভিত্তিক সরকার, যেখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে থাকা দলগুলো অংশ নেবে। সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বহাল আছে। তবে যারা সেই আন্দোলনের অংশ ছিল না, তারা সরকারে অন্তর্ভুক্ত হবে না।
তাদের মধ্যে কি জামায়াতে ইসলামীও পড়ে? না। জামায়াতে ইসলামী’র সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই। আমি মনে করি না, জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারের অংশ হবে।
ছাত্রদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে কেন জোট হলো না? আমরা চেষ্টা করেছি। কিন্তু এনসিপি অনেক বেশি আসনের দাবি করেছিল, যা কার্যত সম্ভব ছিল না। আমরা মনে করি, ওই আসনগুলোতে আমাদের প্রার্থীরা জয়ী হতে পারবেন। তবে সম্পূর্ণ নতুন প্রতীকে এনসিপি প্রার্থীরা জিততে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক।
এই নির্বাচন ভিন্ন, কারণ আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে যতটুকু জানি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলেন—এমন কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তার দলকে নির্বাচনে অংশ না নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং মানুষ ভোট দিতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। আদর্শভাবে তাদের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে ফিরে আসা উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি, এবং এখন আর সেই সুযোগও নেই, কারণ শেখ হাসিনা দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেন না।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রচণ্ড উদ্দীপনা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তার প্রত্যাবর্তন সত্যিকারের উদ্দীপনা তৈরি করেছে। প্রথম ভাষণেই তিনি মানবিক উন্নয়নে স্পষ্টভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। নারী ক্ষমতায়ন, কৃষকের কল্যাণ ও কর্মসংস্থানের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। প্রস্তাবিত ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উপকরণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদনের ভালো দাম পাবেন। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে অন্তত এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছেন এবং তা বাস্তবায়নের পথনির্দেশ দিয়েছেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই টার্মে সীমাবদ্ধ করার এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। শিক্ষা সংস্কারে প্রয়োজনভিত্তিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং মেধাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কারও অগ্রাধিকারে থাকবে, যেখানে কার্যকর ও সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
রাজনৈতিক আলোচনায় ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। কোন বিষয়গুলোর তাৎক্ষণিক সমাধান দরকার? প্রথমত, পানি বণ্টনের সমস্যা শুধু আলোচনা করলেই হবে না, আন্তরিকভাবে সমাধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কোনো সভ্য সমাজে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, বাণিজ্য ইস্যুগুলো যৌক্তিক সমাধান করতে হবে। সাম্প্রতিক ক্রিকেট–সংক্রান্ত ঘটনাটি দুঃখজনক ও অপ্রয়োজনীয় ছিল, যা উভয় পক্ষেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক আস্থাকে সামনে রেখে এসব বিষয়ে দ্রুত আলোচনা হওয়া উচিত। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সফর একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
আগামী দিনে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভূমিকা কতটা প্রভাব ফেলবে? তার প্রভাব রয়েছে, তবে এত বেশি নয় যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এই সংকট তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। দীর্ঘমেয়াদে তিনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক তাকে ছাড়াও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব এবং উচিত।
সবশেষে, ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ইস্যু সত্ত্বেও কি বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রতি নমনীয় হয়েছে? পাকিস্তানকে অবশ্যই ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে—এটাই আমাদের অবস্থান। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের জন্য সব প্রতিবেশী দেশের একসঙ্গে কাজ করা দরকার।
Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
