সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের সময় নবীজি যে আমল করতেন

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৯:৪১:০৮

সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ মহান রবের অনন্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর দ্বারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বান্দাদের সতর্ক করে থাকেন। মহাজাগতিক এই ঘটনার সময়ে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দোয়া ও দান-সদকা করার কথা হাদিসে এসেছে।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, তিনিই সেই সত্তা যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান ও চন্দ্রকে আলোকময় বানিয়েছেন এবং এর (গতির) জন্য কক্ষসমূহ নির্ধারিত করেছেন, যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন। (সুরা ইউনূস, আয়াত: ৫)

মূলত, জাহেলি যুগের মানুষেরা মনে করতো, মহান কোনো ব্যক্তি মারা গেলে কিংবা বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটলে এর প্রেক্ষিতে সূর্য কিংবা চন্দ্রগ্রহণ হয়। রাসুল (সা.) তাদের সেই কুসংস্কার ও বিশ্বাসকে সংশোধন করেন। সেই সঙ্গে মহাজাগতিক এই ঘটনার সময়ে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দোয়া করার তাগিদ দেন।

আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, একবার আমরা রাসুল (সা.) এর কাছে ছিলাম, এ সময় সূর্যগ্রহণ শুরু হয়। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের চাদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আমরাও প্রবেশ করলাম। এরপর তিনি আমাদের নিয়ে সূর্য প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত দুই রাকাত সালাত (নামাজ) আদায় করলেন। তারপর নবীজি (সা.) বললেন- কারও মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ কিংবা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ দেখবে তখন এ অবস্থা কেটে যাওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করবে এবং দোয়া করতে থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৮৩)

সূর্যগ্রহণের সময় যে বিশেষ সুন্নত নামাজ আদায় করতে হয় তাকে সালাতুল কুসুফ (صلاة الكسوف) বলা হয়। আর চন্দ্রগ্রহণের সময় একই ধরনের সুন্নত নামাজকে বলা হয় সালাতুল খুসুফ (صلاة خُسُوف)। এই নামাজ মূলত ২ রাকাতের হয়ে থাকে। তবে চাইলে চার রাকাত বা এর বেশিও পড়া যায়। তবে বিশেষ এই নামাজে আজান ও ইকামত দিতে হয় না।

এ ক্ষেত্রে মাকরুহ ওয়াক্ত ছাড়া (যে সময়ে নামাজ পড়া মাকরুহ) সূর্যগ্রহণের নামাজ মসজিদে জামাতে আদায় করা সুন্নত। এটি দিনের বেলায় হওয়ায় সূর্যগ্রহণের নামাজ বা সালাতুল কুসুফে কেরাত আস্তে পড়তে হয়। তবে এই নামাজে দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সেজদা আদায় করতে হয়। আর প্রথম রাকাতের তেলাওয়াত ও রুকু দ্বিতীয় রাকাতের তুলনায় দীর্ঘ হবে। অন্যদিকে চন্দ্রগ্রহণ যেহেতু রাতে হয় তাই এ উপলক্ষে সালাতুল খুসুফের নামাজ একাকী আদায় করাই সুন্নত।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, একবার রাসুল (সা.) এর যুগে সূর্যগ্রহণ হলে তিনি লোকদের সঙ্গে নামাজ (কুসুফ) আদায়কালে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। অতঃপর তিনি রুকু করে দণ্ডায়মান হন, পুনরায় রুকু করে দাঁড়ান এবং পরে রুকু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এভাবে তিনি প্রত্যেক নামাজে তিনবার রুকু করার পর সিজদায় যান। সেদিন দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে কিছু লোক বেহুঁশ হয়ে যায় এবং তাদের মাথায় পানি ঢালতে হয়। তিনি রুকুতে যেতে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং রুকু থেকে ওঠার সময় ‘সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন। এভাবে নামাজ শেষ করার মধ্যেই সূর্যগ্রহণ শেষ হয়ে যায়। অতঃপর তিনি (নবীজি সা.) বলেন, চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ কারও জন্ম-মৃত্যুর কারণে সংগঠিত হয় না, বরং তা আল্লাহ তা’য়ালার নিদর্শনাবলির অন্যতম দু’টি নিদর্শন। আল্লাহ এর দ্বারা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করে থাকেন। নবীজি (সা.) আরও বলেন, যখন সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ শুরু হবে তখন তোমরা দ্রুত নামাজ আদায়ে মনোনিবেশ করবে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১১৭৭)

এছাড়াও সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সময় জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল হওয়ার কথাও হাদিসে এসেছে। আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তিনি দাঁড়ালেন এ আশঙ্কায় যে, কিয়ামতের মহাপ্রলয় বুঝি সংঘটিত হবে। ওই সময় তিনি (তাড়াতাড়ি) মসজিদে এলেন। অত্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সিজদার সঙ্গে সালাত আদায় করলেন। আমি আর কোনো সালাতে কখনো এমন দেখিনি। এরপর তিনি (রাসুল সা.) বলেন, আল্লাহর প্রেরিত এসব নিদর্শনাবলী কারও মৃত্যুর জন্য হয় না, কারও জন্মের জন্যও হয় না। তিনি এগুলো প্রেরণ করেন তাঁর বান্দাদের সতর্ক করার জন্য। যখন তোমরা এসব নিদর্শনাবলীর কিছু দেখতে পাও তখন তোমরা আতঙ্কিত হৃদয়ে আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল হও। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৮৯)

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।