তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রসিকিউটরের
এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তার অভিযোগ, ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে’ টাকা আয়ের হাতিয়ার করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। গতকাল সোমবার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে দুটি মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। সেই দুই মন্তব্যে তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল–মামুন এবং আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হককে ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) করা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া এবং চানখাঁরপুল এলাকায় ‘গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া’ একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করার অভিযোগ করেছেন তিনি। কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদের পোস্টে দুটি মন্তব্য করেছেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। এ ছাড়া দুটি প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন তিনি।
একটি মন্তব্যে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ লিখেছেন, গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি এসআই আবজালুল হকের স্ত্রী সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর তামিমের কক্ষে প্রবেশ করেন। বিষয়টি দেখার পর তাজুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাজুল ইসলাম এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদেরকে বকাঝকা করেছিলেন। সুলতান মাহমুদ আরও লিখেছেন, তামিম তখন সবার সামনে এসআই আফজালের স্ত্রীর তার কক্ষে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হয়। বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের সেই মামলার রায় হয়েছে গত ৫ ফেব্রুয়ারি। রায়ে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে দেওয়া হয় রায়ে। প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সেখানে আরও লেখেন, ‘চানখাঁরপুলের মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে এ রকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরেও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে।’
সেখানে সুলতান মাহমুদ প্রশ্ন করেছেন, ‘রংপুরের আবু সাঈদের মামলায় এসি ইমরানকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো? এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেছে। তারপর সাবেক আইজি আবদুল্লাহ আল–মামুনকে কী কারণে রাজসাক্ষী করা হলো?’ জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। গত বছরের ১৭ নভেম্বরের সেই রায়ে এই মামলার অপর আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে (অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি মন্তব্যে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ লেখেন, ‘শুধু আইজি মামুন নয়, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় টাকার বিনিময়ে আফজালকেও রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিন–চারজনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকেই এই চক্রে জড়িত।’ তিনি অভিযোগ করে লেখেন, ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।’ চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ বাতিলের পর সোমবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাজুল ইসলাম। তখন তাকে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের করা অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। এগুলোকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন।
এর জবাবে বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে হচ্ছে কে কী অভিযোগ করছে, এগুলো আমরা আমলে নিচ্ছি না। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ থেকে কে কী বলছে, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।’ তারপর আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ উনি স্পষ্টভাবে একটি অভিযোগ এনেছেন। এই তামীম সাহেবকে উদ্ধৃত করে যে ওনার (তামীম) রুমে এসআই আবজালুলের স্ত্রী ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে এসেছে। সেটা আপনাকে জানিয়েছে।’ তখন তাজুল ইসলাম বলেন, ‘না, এটা আমার জানা নেই।’
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এই জাতীয় অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখেছি, এগুলো সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। ব্যক্তিগত হিংসা চরিতার্থ করার জন্য যদি কেউ এই ধরনের কথা বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, এইখানে ট্রাইবুনালে বিচারপ্রক্রিয়াতে যা কিছু হয়েছে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) এবং সেটা আদালতের মাধ্যমে কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং আজকে এই মুহূর্তে যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো মিথ্যা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের গোটা জনগণ সাক্ষী, মিডিয়া সাক্ষী। আপনারা জানেন যে কী ধরনের ট্রান্সপারেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, দু–একজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের থেকে সে বুঝে হোক, না–বুঝে হোক যদি বলে, সেগুলোকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যে মনে করি না।’
Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


























মন্তব্য