ডিজিটাল অ্যাড vs ট্র্যাডিশনাল অ্যাড, কোনটা আসলে “ভ্যালু ফর মানি”?

২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ৪:৩২:০০

ছবি: সংগৃহীত

আজকের দিনে মার্কেটিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি শোনা একটা প্রশ্ন হলো – ডিজিটাল অ্যাড ভালো, না ট্র্যাডিশনাল অ্যাড? অনেকে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, “এই যুগে পেপার অ্যাড, বিলবোর্ড, টিভি অ্যাড দিয়ে আর কাজ নেই। ওই টাকায় ফেসবুক বা ডিজিটালে বুস্টিং করলে অনেক বেশি মানুষের কাছে, তাও আবার টার্গেটেড কাস্টমারের কাছে পৌঁছানো যায়।”

কথাটা ভুল না। কিন্তু পুরো সত্যও না। এ্যাড শুধু মানুষকে পৌঁছানোর বিষয় না, এটা মানুষের মাথায় জায়গা করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার জায়গাটা ধরে রাখা। চলুন বাস্তবভাবে দেখি।

ডিজিটাল অ্যাড: কম খরচ, দ্রুত রেজাল্ট

ডিজিটাল অ্যাড, বিশেষ করে ফেসবুক বুস্টিং, আজ সবচেয়ে সহজলভ্য মাধ্যম। ১০০০ টাকা থাকলেও অ্যাড চালানো যায়। বয়স, লোকেশন, আগ্রহ, সব টার্গেট করা যায়। স্টার্টআপ, ছোট ব্যবসা, নতুন উদ্যোক্তার জন্য এটা দারুণ কার্যকর। আজ অ্যাড দিলেন, আজই রিচ দেখলেন, ইনবক্স পেলেন, লিড এলো, সেল হলো।

কিন্তু এখানেই একটা সীমাবদ্ধতা আছে। একজন সাধারণ মানুষ দিনে শত শত ডিজিটাল অ্যাড দেখে। স্ক্রল করতে করতে চোখে পড়ে, আবার স্ক্রলেই হারিয়ে যায়। বেশিরভাগ অ্যাড দেখা হয়, কিন্তু মনে থাকে না।

ডিজিটাল অ্যাড মূলত কনভার্সনের জন্য ভালো, সবসময় ব্র্যান্ড ট্রাস্ট তৈরি করার জন্য না।

ট্র্যাডিশনাল অ্যাড: বিশ্বাস আর উপস্থিতি

পেপার অ্যাড, বিলবোর্ড বা টিভি অ্যাড এই সবগুলোই ব্যয়বহুল। ছোট সাইজের পেপার অ্যাড হলেও ২০–৫০ হাজার টাকার নিচে করা কঠিন। টিভি অ্যাড বা বিলবোর্ড তো আরও বড় বিনিয়োগ। এই কারণেই সবাই এটা করতে পারে না। আর ঠিক এখানেই এর শক্তি।

একজন কাস্টমার যখন পত্রিকায় কোনো ব্র্যান্ডের অ্যাড দেখে, অবচেতনে একটা ধারণা তৈরি হয়-
“এই ব্র্যান্ডটা সিরিয়াস।”
“এই ব্র্যান্ডটা টিকে থাকার মতো শক্ত।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পত্রিকা, টিভি এখনো বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ফিনান্স, বড় সার্ভিস ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে।

আরেকটা বড় পার্থক্য হলো স্মৃতি। পত্রিকার অ্যাড মানুষ স্ক্রল করে ফেলে দেয় না। চোখ থামে। অনেকে কেটে রেখে দেয়। পরিবারের অন্যদের দেখায়। একটা ভালো পেপার অ্যাড অনেকদিন মাথায় থাকে।

বিলবোর্ডের অ্যাড চোখ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই । বিলবোর্ড অ্যাডের একটা আলাদা মনস্তত্ত্ব আছে। এটা মানুষ “খুঁজে” দেখে না, চোখে পড়ে। রোজ অফিস যাওয়ার পথে, বাসে বসে, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে – একই বিলবোর্ড বারবার দেখা হয়। এই রিপিটেশন ব্র্যান্ডকে মাথার ভেতরে বসিয়ে দেয়।

ফেসবুক অ্যাড স্কিপ করা যায়। বিলবোর্ড স্কিপ করা যায় না। এই কারণেই বড় ব্র্যান্ডগুলো এখনো বিলবোর্ড ছাড়ে না।

আবার, টিভি অ্যাড ব্যয়বহুল। কিন্তু এর প্রভাব আলাদা। একটা ভালো টিভিসি শুধু পণ্য বিক্রি করে না- গল্প বলে, আবেগ তৈরি করে। বাংলাদেশে এখনো টিভি পরিবার নিয়ে দেখা হয়। একটা অ্যাড একসাথে অনেক মানুষের চোখে পড়ে। এই মাধ্যমটাই ব্র্যান্ডকে “ঘরের মানুষ” বানায়।

বাস্তব উদাহরণ: বড় ব্র্যান্ডরা কী করে?

এখন প্রশ্ন আসে— গ্রামীণফোন, বিকাশ, ইউনিলিভার এদের মতো বড় ব্র্যান্ড গুলোকে তো সবাই চেনে। তবুও তারা কেন এতো এতো বিলবোর্ড, টিভি অ্যাড, পেপার অ্যাড দেয়?

কারণ তারা একটা দিনের জন্যও কাস্টমারের মাথা থেকে সরে যেতে চায় না।

গ্রামীণফোন
বাংলাদেশে এমন মানুষ পাওয়া কঠিন যে গ্রামীণফোন চেনে না। তবুও রাস্তায় বের হলেই বিলবোর্ড, টিভিতে নিয়মিত বিজ্ঞাপন। কারণ নেটওয়ার্ক শুধু কানেকশন না- এটা বিশ্বাস আর নির্ভরতা।

বিকাশ
বিকাশ এখন মোবাইল ফাইন্যান্সের সমার্থক। তবুও টিভি, বিলবোর্ড, পত্রিকায় নিয়মিত উপস্থিতি। কারণ টাকা আর বিশ্বাস একসাথে চলে।

ইউনিলিভার
লাক্স, লাইফবয়, রিন- এই নামগুলো প্রজন্ম ধরে পরিচিত। তারপরও প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অ্যাড চলছে। কারণ তারা জানে- চোখের আড়াল মানেই মনের আড়াল। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই ব্র্যান্ডগুলো ডিজিটাল অ্যাডও করে, আবার ট্র্যাডিশনাল মিডিয়াও ছাড়ে না। কোনোটাকেই তারা বাদ দেয় না।

তাহলে কোনটা আসলে “ভ্যালু ফর মানি”? আসল প্রশ্নটা মাধ্যম না। আসল প্রশ্নটা উদ্দেশ্য।

দ্রুত লিড, সেল, ইনবক্স চাইলে → ডিজিটাল অ্যাড
দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড ইমেজ ও ট্রাস্ট চাইলে → ট্র্যাডিশনাল অ্যাড
ছোট বাজেট, নতুন ব্যবসা → ডিজিটাল ফার্স্ট
বড় ভিশন, স্থায়ী পরিচিতি → মাল্টিচ্যানেল অ্যাপ্রোচ
সবচেয়ে শক্ত ব্র্যান্ডগুলো একমুখী হয় না। তারা জানে, ডিজিটাল মানুষকে আনে, ট্র্যাডিশনাল মানুষকে ধরে রাখে।

শেষ কথা একটাই-
অ্যাড মানেই শুধু আজকের রিচ না, আগামী দিনের স্মৃতি।
আর যে ব্র্যান্ড মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নিতে পারে, তার জন্য খরচ কখনোই অপচয় হয় না।

মোহাম্মদ ওমর ফারুক, পরিচালক, আউটরিচ ও পাবলিক রিলেশনস, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য