এবার তুরস্ক ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা ইসরাইলের
এবার দুই প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক ও গ্রিস পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। কিন্তু দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক মোটেও ভালো নয়। সম্পর্কের অবনতির মূল কারণ এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সীমানা নির্ধারণ, খনিজ সম্পদ (তেল ও গ্যাস) অনুসন্ধানের অধিকার এবং বিভক্ত দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস নিয়ে বিরোধ। এছাড়া সমুদ্র উপকূলের অধিকার, দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব (লোজান চুক্তি) এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে প্রবেশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে অনেক দিন ধরেই। গ্রিস দাবি করে আসছে, তাদের দ্বীপগুলোর অবস্থানের ভিত্তিতেই কন্টিনেন্টাল শেলফ বা মহাদেশীয় তাক নির্ধারিত হবে। কিন্তু তুরস্ক গ্রিসের এই দাবি মানতে নারাজ। তুরস্ক মনে করে, গ্রিসের এই দাবি সাগরে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে তাদের অধিকার সংকুচিত করবে। সাগরের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং সমুদ্রসীমা নিয়ে লিবিয়ার সঙ্গে তুরস্কের চুক্তি স্বাক্ষর গ্রিসের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ককে আরো তিক্ত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইপ্রাস ইস্যু। বিভক্ত দ্বীপরাষ্ট্রটির এক অংশ তুরস্কের সঙ্গে এবং অন্য অংশ গ্রিসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। এসব ইস্যুই তুরস্ক-গ্রিস সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে গেছে। আর এই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসকে তুরস্কের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরাইল।
গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস সরকার ইসরাইলের তুরস্কবিরোধী পরিকল্পনার অংশ হয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিভেদ বাড়িয়ে তুলেছে। ভৌগোলিকভাবে ইসরাইল খুবই সংকীর্ণ একটি দেশ, যার সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ মাত্র ১০ কিলোমিটার (ছয় মাইল)। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ এবং এর সিংহভাগ শিল্পকারখানা ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ডে অবস্থিত। এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে ইসরাইলের জন্য একটি কৌশলগত বাফার জোনে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ইসরাইলের অর্থনীতি বিদেশের বাজারের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। ফলে সাগরে বাণিজ্যপথ খোলা রাখা ইহুদি বর্ণবাদী দেশটির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী পানি সংকটে ভুগতে থাকা ইসরাইলের জন্য ভূমধ্যসাগর পানির এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ২০১০ সালে উপকূলীয় অঞ্চলের লেভিয়াথান এবং তামার গ্যাসক্ষেত্রের মতো প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভান্ডার আবিষ্কার ভূমধ্যসাগরের ওপর ইসরাইলের নির্ভরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এই গ্যাস সম্পদ ইসরাইলের জ্বালানি স্বায়ত্তশাসনের জন্য অপরিহার্য। নিজের অস্তিত্ব এবং এই অঞ্চলের কৌশলগত ও সামরিক ভারসাম্য—উভয়ের জন্যই ভূমধ্যসাগর ইসরাইলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১০ সালে গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য বেসামরিক সাহায্যকারী নৌবহর ‘মাভি মারমারা’র ওপর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরাইলের হামলায় বেশ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনায় ইসরাইল-তুরস্ক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর পরই ইসরাইলি সামরিক বিমানের জন্য তুরস্কের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে ইসরাইলি বিমানবাহিনী তাদের প্রশিক্ষণ ও অভিযানের জন্য বিকল্প এলাকা খুঁজতে বাধ্য হয়। এর অংশ হিসেবে দেশটি গ্রিস এবং তাদের সমর্থিত দ্বীপরাষ্ট্র গ্রিক সাইপ্রাস প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর আগে দেশ দুটির সঙ্গে ইসরাইলের সীমিত সম্পর্ক ছিল। কিন্তু গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে নতুন সামরিক সম্পর্কের সুবাদে ইসরাইল দেশ দুটির আকাশসীমা ও ভূখণ্ড বড় আকারের সামরিক মহড়ার জন্য ব্যবহার শুরু করে। এছাড়া তারা তাদের আকাশে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি ভরার এবং দূরপাল্লার বোমাবর্ষণের প্রশিক্ষণ পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছে। এ দুটি বিষয়ই ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার মতো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই তিন দেশ নিজেদের এই অঞ্চলের ‘অমুসলিম’, ‘পশ্চিমা ধাঁচের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র’ এবং ‘প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে তাদের একটি নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই পরিচয় নির্মাণকে একই সঙ্গে তুরস্কের বিরুদ্ধে একটি ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার উপাদান হিসেবেও দাঁড় করানো হচ্ছে। ইসরাইল, গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস তুরস্কের আঞ্চলিক নীতিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। তারা এই অঞ্চলে চলমান ক্ষমতার লড়াইকে ‘সভ্যতার মূল্যবোধ’, ‘গণতান্ত্রিক পরিচয়’ এবং ‘আঞ্চলিক অন্তর্ভুক্তি’র মাধ্যমে রূপ দিতে চায়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এই দেশ দুটির সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গত শতকের পঞ্চাশের দশকের ‘প্রান্তিক জোট’ মতবাদের একটি আধুনিক সংস্করণ বলা যায়। ইসরাইল তার আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা ভাঙতে শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে শত্রুর বিরুদ্ধে কৌশলগত পরিবেষ্টন তৈরির চেষ্টা করছে। গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতা ‘কৌশলগত পরিবেষ্টন’ কৌশলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, যা তুরস্কের সঙ্গে দেশ দুটির সম্পর্ক অবনতির পর গড়ে উঠেছে।
গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইসরাইলের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য আছে। প্রথমটি হলো, এই অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব কমানো এবং দ্বিতীয়টি হলো নিজের কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা ভাঙা। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস ইসরাইলি বিমানবাহিনী এবং নৌবাহিনীর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘কৌশলগত সুবিধা’ প্রদান করে। সামরিক মহড়া এবং বড় কোনো সংকটের ক্ষেত্রে ইসরাইলি বাহিনীর মুভমেন্টের জন্য এই অঞ্চল হবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইল বর্তমানে গ্রিস এবং গ্রিক সাইপ্রাসের কাছে সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির পাশাপাশি বড় আকারের যৌথ নৌ-মহড়া আয়োজনের মাধ্যমে দেশ দুটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এর বিনিময়ে দুটি ইইউ সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে গ্রিস এবং গ্রিক সাইপ্রাস ব্রাসেলসে ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরাইল তার সামরিক প্রযুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবির মাধ্যমে এই দুই দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে। সংক্ষেপে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস যেমন ইসরাইলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক তদবির ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, তেমনি ইসরাইলেরও ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই দুই দেশের ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রয়োজন।
এ কারণে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ইসরাইলের জন্য ‘কৌশলগত সম্পদ’ হিসেবে কাজ করে। এটাকে এমন একটি ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে সংকটকালে বেসামরিক ও সামরিক সম্পদ আশ্রয় নিতে পারে বা রসদ সরবরাহ পেতে পারে। এই বাস্তবতার নিরিখে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের কাছে ইসরাইল প্রযুক্তি বিক্রি করে একদিকে অর্থ অর্জনের পাশাপাশি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কাঠামো প্রসারিত করে, অন্যদিকে তুরস্কের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নিজের অনুকূলে আনারও চেষ্টা করে। তবে এই পরিস্থিতি গুরুতর সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। কারণ ন্যাটোর সদস্য হয়ে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস সংস্থার আরেক সদস্য তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে কৌশলগত সুবিধা দেওয়ায় তা জোটের সম্মিলিত নিরাপত্তা ও সংহতির নীতির পরিপন্থী এবং ন্যাটোকে দুর্বল ও বিভক্ত করছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ন্যাটোর সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন ছিল এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ন্যাটোর দুই সদস্যদেশ তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে জোটের দক্ষিণ-পূর্বাংশকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল। বর্তমানে ইসরাইলও এই দুই দেশের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে একই ভূমিকা পালন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে গ্রিসের ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ প্রকল্পটি সামনে আসে। অ্যাকিলিস শিল্ড হলো ইসরাইলের আয়রন ডোম সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে গ্রিসের নকশা করা একটি সাত-স্তরবিশিষ্ট সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো, যার লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন থেকে সৃষ্ট হুমকির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা। এই প্রকল্পে স্পাইডার, বারাক এমএক্স এবং ডেভিড’স স্লিংয়ের মতো ইসরাইলি উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে অত্যাধুনিক রাডার এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল নেটওয়ার্ককে একত্র করা হয়েছে, যাতে এজিয়ান সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও সীমাবদ্ধ করা যায়। ইসরাইল এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিম দিকে তার আগাম সতর্কীকরণ নেটওয়ার্ক প্রসারিত করার পাশাপাশি তুরস্ককে ঘিরে থাকা গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসকে এই মুসলিম দেশটির বিরুদ্ধে প্রক্সি শক্তিতে পরিণত করছে। একই সঙ্গে তুরস্ককে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলের জ্বালানি ও নিরাপত্তা কাঠামোকেও নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরাইল।
এটা স্পষ্ট, প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে তুরস্ককে ঘিরে ফেলার ইসরাইলের কৌশল তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা মোকাবিলার জন্য পরিকল্পিত একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কাঠামো। এই কৌশলের মূলে আছে তুরস্ককে তুর্কি প্রজাতন্ত্র উত্তর সাইপ্রাস (টিআরএনসি)-ক্রিট রেখায় সীমাবদ্ধ এবং নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির মধ্যে রাখা। এর মাধ্যমে তুরস্ককে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় নিরাপত্তা সমীকরণ থেকে বের করে তার ভূমধ্যসাগরীয় ও এজিয়ান উপকূলরেখায় আটকে রাখতে চায় ইসরাইল। ইসরাইলের এই বহুমুখী পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তুরস্ক কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সেদিকেই নজর রাখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সর্বশেষ
Office: Airport haji camp
Phone: +8801712856310
Email: sangbadbela@gmail.com
Developed by RL IT BD


মন্তব্য