সোমবার ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:৪৫ অপরাহ্ণ

পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় যে অস্ত্র এখন ইরানের হাতে

১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:০০:১৯

এবার দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, আর হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তেলবাহী জাহাজ— সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে। পারমাণবিক অস্ত্র নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণই এখন ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে সামনে আসছে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত ও যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর প্রভাব খাটিয়েই তেহরান বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণই ইরানকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই পারমাণবিক শক্তির চেয়েও কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত এই দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর বিরতির ঘোষণা দেয়া হয় এমন এক সময়ে, যখন এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন যে ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’। শেষ পর্যন্ত সেই সময়সীমা পেরিয়ে যায়, পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় সংঘাতও থেমে যায়। আর ইরান তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থান অর্জন করে নেয়। আর সেটি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিন্দুর কারণে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। হামলা শুরুর ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি হামলা হয়। কিন্তু ইরান সরাসরি পাল্টা শক্তি প্রদর্শনে যায়নি। বরং তারা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়। আর তা হলো— একটি দরজা বন্ধ করে দেয়া। আর সেই দরজা হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। এটি পারস্য উপসাগর থেকে সমুদ্রপথে বের হওয়ার একমাত্র রাস্তা। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের দৈর্ঘ্য ৩৩ মাইল এবং প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট ব্যবহারের এক-পঞ্চমাংশ। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের জ্বালানি এই পথেই পরিবাহিত হয়।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান এই পথ বন্ধ করে দিলে কয়েক দিনের মধ্যেই দুবাই ক্রুড তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১৬৬ ডলার, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এটিকে তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন বলে আখ্যা দেয়। ৩২টি দেশ জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়তে বাধ্য হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি কার্যত কেঁপে ওঠে, আর সেটি কোনও পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই। ইসরায়েলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক চক ফ্রাইলিখ বলেন, এই যুদ্ধে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটাই অর্জিত হয়নি— না সরকার পরিবর্তন, না পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, না ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা হ্রাস। তার মতে, সামরিক সাফল্য থাকলেও কৌশলগতভাবে এটি ব্যর্থতা।

যুদ্ধবিরতির শর্তগুলোই দেখিয়ে দিচ্ছে যে কে বাস্তবে সুবিধা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধে রাজি হয়েছে, আর ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমান এই পথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল নিতে পারবে, যা দিয়ে ইরান তার সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করতে পারে। ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনায় রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার— আর এগুলোকেই ট্রাম্প নিজেই ‘আলোচনার ভিত্তি’ হিসেবে স্বীকার করেছেন। হরমুজ ছাড়াও ইরানের হাতে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ— বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এটি ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝে অবস্থিত এবং সুয়েজ খালের দক্ষিণ প্রবেশপথ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। এটি বন্ধ হলে ইউরোপ এশিয়ার সঙ্গে সমুদ্রপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে বড় বড় শিপিং কোম্পানি এই রুটে চলাচল স্থগিত করেছে।

ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরা গাজা যুদ্ধের সময় লোহিত সাগরের ট্রাফিক ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছিল। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের এক উপদেষ্টা বলেন, প্রয়োজনে এই পথও হরমুজের মতো নিয়ন্ত্রণে নেয়া হবে। অর্থাৎ, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব— এই দুটি প্রণালি মিলেই পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে। বর্তমানে হরমুজ এলাকায় শত শত জাহাজ আটকে রয়েছে এবং হাজারও নাবিক অপেক্ষা করছেন নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য। এই পরিস্থিতি এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করেছে। মূলত ইরান এমন এক জলপথে প্রভাব বিস্তার করছে, যা বৈধভাবে তেহরানের মালিকানাধীন নয়, কিন্তু কার্যত সেখানে ইরানেরই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

অধ্যাপক ফ্রাইলিখ বলেন, এই বাস্তবতা হয়তো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি, যা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্ব পাবে। অর্থাৎ ইরানের শক্তি মূলত পারমাণবিক নয়, বরং ভূগোলভিত্তিক। এই ভৌগলিক সত্যকে বোমা মেরে ধ্বংস করা যায় না। হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবকে কোনও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আর তাই এই যুদ্ধের শিক্ষাও খুবই স্পষ্ট। আর তা হচ্ছে— ইরান পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং একটি ‘দরজা’ নিয়ন্ত্রণ করে এই সংঘাতে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। আর সেই দরজার চাবি এখনও ইরানের হাতেই রয়েছে।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


মন্তব্য

সর্বশেষ

Editor & Publisher: Md. Abdullah Al Mamun

Office: Airport haji camp

Phone: +8801712856310

Email: sangbadbela@gmail.com

Developed by RL IT BD