সরস্বতী দেবী ও বিদ্যা অর্জনের দর্শন
ছবি: সংগৃহীত
উপমহাদেশের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বিদ্যার ধারণা কেবল জ্ঞান সঞ্চয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা আত্মোন্নয়ন, নৈতিকতা ও মানবিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই বিদ্যা চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন বিদ্যাদায়িনী মা শ্রীশ্রীসরস্বতী। তিনি জ্ঞান, বুদ্ধি, বাক্শক্তি, সংগীত, সাহিত্য ও শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস্বতী দেবী তাই কেবল পূজার বিষয় নন, তিনি প্রাচ্য সভ্যতার বৌদ্ধিক ও নৈতিক আদর্শের প্রতীক।
বৈদিক যুগে সরস্বতী দেবীর ধারণা প্রথমে একটি পবিত্র ও শক্তিশালী নদীরূপে বিকশিত হয়। ঋগ্বেদে সরস্বতীকে ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে’ বলে অভিহিত করা হয়েছে— যেখানে তিনি জননী, শ্রেষ্ঠ নদী ও দেবী তমা। নদী যেমন সভ্যতার প্রাণ স্রোত, তেমনি বিদ্যাও মানবজীবনের মূল চালিকাশক্তি। এই নদীরূপা সরস্বতী ধীরে ধীরে বাক্শক্তি ও জ্ঞানের প্রতীকে রূপান্তরিত হন, কারণ ভাষা ও চিন্তাই মানবসভ্যতার বিকাশের প্রধান মাধ্যম।
পরবর্তী পুরান যুগে সরস্বতী দেবী সুস্পষ্টভাবে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, দেবীভাগবত পুরাণ ও পদ্মপুরাণে তাঁকে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার শক্তি স্বরূপা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে— “সরস্বতী মহাভাগা বিদ্যারূপা বরাননা।”
অর্থাৎ, দেবী সরস্বতী বিদ্যারই জীবন্ত স্বরূপ। এই ভাবনা অনুযায়ী, বিদ্যা কেবল মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল নয়,এটি এক প্রকার দিব্য অনুগ্রহ, যা সাধনা, শুদ্ধাচার ও বিনয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
সরস্বতী দেবীর প্রতীকতত্ত্ব বিদ্যা অর্জনের দার্শনিক ভিত্তি সুস্পষ্ট করে। তিনি শ্বেতবর্ণা ও শ্বেতবস্ত্রধারিণী— যা পবিত্রতা, নির্মলতা ও সত্ত্বগুণের প্রতীক। তাঁর করকমলে পুস্তক শাস্ত্রজ্ঞান ও প্রজ্ঞার, বীণা সৃজনশীলতা ও সংগীত চেতনার, অক্ষমালা ধ্যান ও আত্মসংযমের এবং বরমুদ্রা অনুগ্রহ ও কল্যাণ দানের প্রতীক। তাঁর বাহন রাজহাঁস নীর–ক্ষীর বিচারক্ষমতার মাধ্যমে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষমতার ইঙ্গিত বহন করে। এই সমস্ত প্রতীক মিলিয়ে এক আদর্শ শিক্ষাদর্শন গড়ে ওঠে, যেখানে জ্ঞান, শীল ও বিবেক অবিচ্ছিন্ন।
সরস্বতী দেবীর সঙ্গে বিদ্যা অর্জনের সম্পর্ক সর্বাধিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে। সরস্বতী পূজার দিনে শিক্ষার্থীরা তাঁদের পুস্তক, বাদ্যযন্ত্র ও শিক্ষাসামগ্রী দেবীর চরণে নিবেদন করে। ‘হাতেখড়ি’ প্রথার মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যারম্ভ এই পবিত্র তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয়। পূজার দিনে অধ্যয়ন পরিহার করে বিদ্যার প্রতি বিনয় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, যা শিক্ষা দেয় যে জ্ঞান কখনো ভোগের বস্তু নয়; এটি সাধনার ফল।
উপমহাদেশের শিক্ষাদর্শনে বিদ্যার চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল পেশাগত সাফল্য নয়, বরং চরিত্র গঠন। এই দর্শনটি সুবিখ্যাত শ্লোকে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে— “বিদ্যা দদাতি বিনয়ং।”
অর্থাৎ, প্রকৃত বিদ্যা বিনয় প্রদান করে। বিনয়হীন জ্ঞান অহংকার সৃষ্টি করে, কিন্তু বিনয়যুক্ত বিদ্যাই মানুষকে সামাজিক ও নৈতিকভাবে উন্নত করে।
সমকালীন বিশ্বে, যেখানে তথ্য ও প্রযুক্তির অভাব নেই কিন্তু প্রজ্ঞা ও মানবিকতার সংকট স্পষ্ট, সেখানে সরস্বতী দেবীর শিক্ষাদর্শন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে বিদ্যা মানে কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, এটা শীল, সংযম, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণের সমন্বয়। অতএব, সরস্বতী দেবীর আরাধনা মানে কেবল ধর্মীয় আচার পালন নয়— বরং বিদ্যার মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন ও সমাজকল্যাণের পথে অগ্রসর হওয়া।
লেখক: ড. প্রণবানন্দ চক্রবর্ত্তী, ধর্মতত্ত্ববিদ ও ভাগবত পাঠক
পিএইচডি (পুণে), কাব্য-ব্যাকরণতীর্থ; অধ্যক্ষ, দয়াময়ী চতুষ্পাঠী;
উপ-পরিচালক, উত্তরা ইউনিভার্সিটি।
Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

























মন্তব্য