শনিবার ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ০৪:৩৯ অপরাহ্ণ

আসলে কে সেই সিরিয়াল কিলার, বেরিয়ে এলো সব বিস্ময়কর তথ্য

২০ জানুয়ারি, ২০২৬ ৯:৪৬:৫১
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সাভারের পরিত্যক্ত পৌরসভা কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞাত পরিচয়ে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হয়েছে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। পুলিশ জানিয়েছে, ভবঘুরের ছদ্মবেশে থাকা ওই ব্যক্তি অন্তত ছয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

গ্রেপ্তার ও পরিচয় প্রকাশ
এই ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট (৪০) বলে তিনি নিজেকে পরিচয় দিলেও পুলিশ জানিয়েছে, তার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, সবুজ শেখ মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের বাসিন্দা এবং পান্না শেখের ছেলে। আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে আসছিলেন।

ছদ্মনাম ও ভুয়া পরিচয়ের ফাঁদ
পুলিশ জানায়, সবুজ শেখ নিজেকে কখনো ‘কিং সম্রাট’, কখনো ‘মশিউর রহমান খান সম্রাট’ নামে পরিচয় দিতেন। এমনকি তিনি সাভার পৌর এলাকার এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামের সঙ্গে মিল রেখে নিজের নাম বলতেন, যাতে সন্দেহ এড়ানো যায়। তবে তার দেওয়া কোনো ঠিকানা বা পারিবারিক তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

হত্যার কৌশল ও ভয়ংকর মানসিকতা
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ভবঘুরে নারী-পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। পরে তাদের সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনসহ নির্জন স্থানে নিয়ে যেতেন। শারীরিক সম্পর্কের পর ওই নারী অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক করেছে—এমন সন্দেহ হলেই তিনি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন এবং একপর্যায়ে হত্যা করতেন।

পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন বিকৃত রুচির মানুষ এবং তার আচরণে সাইকোপ্যাথিক প্রবণতা স্পষ্ট।

তানিয়া হত্যাকাণ্ড ও জোড়া খুনের ভয়াবহতা
সবশেষ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এনে রাখেন। পরে ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবকের অনৈতিক সম্পর্ক দেখে প্রথমে যুবককে দোতলায় নিয়ে হত্যা করেন তিনি। এরপর নিচতলায় তানিয়াকে হত্যা করে দুটি মরদেহ কাঁধে করে দোতলার টয়লেটে নিয়ে যান এবং সেখানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন।

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে ভয়ংকর দৃশ্য
ঘটনার পর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে মরদেহ কাঁধে করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ওই ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিহত তরুণীর পরিবারের সদস্যরা ভিডিওতে দেখা সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে সাভার মডেল থানায় হাজির হন। পরে পুলিশ নিশ্চিত করে, নিহত তরুণীর নাম তানিয়া আক্তার।

নিহত তানিয়ার পরিচয়
পুলিশ জানায়, তানিয়া আক্তার মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় মায়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১ জানুয়ারি থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

ছয় হত্যার স্বীকারোক্তি ও আদালতে জবানবন্দি
গ্রেপ্তারের পর সোমবার অভিযুক্ত সবুজ শেখকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

‘থার্টি ফোর’ ও ‘সানডে মানডে ক্লোজ’: নিজস্ব কোড ভাষা
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডকে নিজের ভাষায় ‘থার্টি ফোর’ বা ‘সানডে মানডে ক্লোজ’ নামে উল্লেখ করতেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেন, কোনো ভবঘুরে নারী বা পুরুষকে অনৈতিক কাজে লিপ্ত দেখলেই তিনি তাদের ‘ক্লোজ’ করে দিতেন।

মানসিক অবস্থা ও নেশার প্রভাব
সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি মানসিক রোগী নন। তবে অতিরিক্ত নেশার কারণে তিনি মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং একপর্যায়ে হত্যা করাই তার নেশায় পরিণত হয়।

আগের মরদেহ উদ্ধার ও তদন্তের অগ্রগতি
পুলিশ জানায়, গত কয়েক মাসে ওই পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টার এলাকা থেকে এক বৃদ্ধা, একাধিক অজ্ঞাত নারী ও পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হলে পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরা ও আলোর ব্যবস্থা করে। শেষ পর্যন্ত সেই সিসিটিভি ফুটেজই সিরিয়াল কিলার শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আরও হত্যার আশঙ্কা, তদন্ত অব্যাহত
সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলী বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি ছয়টি হত্যার কথা স্বীকার করলেও এর বাইরে আরও কোনো অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন—তদন্তে সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব তথ্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


মন্তব্য

সর্বশেষ

Editor & Publisher: Md. Abdullah Al Mamun

Office: Airport haji camp

Phone: +8801712856310 Email: sangbadbela@gmail.com

Developed by RL IT BD