শুক্রবার ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ০১:২৮ অপরাহ্ণ

শালঘর মধুয়া নীল কুঠির ইতিবৃত্ত

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ৪:১৬:১০
ছবি প্রতিনিধি, সংবাদ বেলা

কুষ্টিয়া–নদীয়া অঞ্চলের নীলচাষ, শালঘর-মধুয়া নীলকুঠি, প্যারীসুন্দরীর নেতৃত্বে প্রতিরোধ, আর তার প্রেক্ষিতে মীর মশাররফের জমিদার দর্পণ-এর শব্দ—সবকিছু, তারিখ ও সূত্রসহ বর্ণনা করা হলো ।

শালঘর-মধুয়া নীলকুঠি: কোথায়, কার, কেন আলোচিত ?

উনিশ শতকের মাঝামাঝি কুষ্টিয়া–কুমারখালী–মিরপুর–নদীয়া জুড়ে নীলকারখানার জাল গড়ে ওঠে। সেই জালের “প্রধান কুঠি”গুলোর একটি ছিল শালঘর-মধুয়া (আজকের কুষ্টিয়া অঞ্চলে), যা ব্রিটিশ নীলকর টমাস আইভান কেনি (T. I. Kenny)–র অধীনে পড়ত। কুষ্টিয়ার শহরে বেকিদালান লেনে ছিল কেনির কাচারি; আর কুঠি ছিল কাছাকাছি শালঘর-মধুয়ায়—এমন বর্ণনা স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক সংকলন ও নিবন্ধে স্পষ্ট।

মীর মশাররফ হোসেনের গদ্যরচনার আলোচনা-সংকলনেও সরাসরি উল্লেখ আছে—“শালঘর মধুয়ার নীলকুঠির মালিক টমাস কেনীর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে… ঘটনাবলীর সময়কাল ১৮৪৪ থেকে…”—যা দেখায় এই কুঠিটি তাঁর স্মৃতিকথার পরিসরেও প্রধান হয়ে উঠেছিল।

“প্যারীসুন্দরী বনাম কেনি”: নীলবিদ্রোহের স্থানীয় চূড়া (১৮৫৯–৬০)

অবিভক্ত নদীয়া জেলার মিরপুর এলাকার জমিদার-কন্যা প্যারীসুন্দরী দেবী নীলকরদের জুলুমের বিরুদ্ধে কৃষক-প্রজাদের সংগঠিত করেন। জনপ্রচলিত কাহিনি ও দলিলভিত্তিক নিবন্ধে আছে—তাঁর লাঠিয়াল ও কৃষকেরা কেনির শালঘর-মধুয়া কুঠিতে আক্রমণ চালায়; কেনি এ নিয়ে মামলা করলেও প্রতিরোধ দমে না। এই ঘটনাগুলো ১৮৫৯–৬০-এর সর্বভারতীয় নীলবিদ্রোহের স্থানীয় প্রতিফলন হিসেবেই ধরা হয়।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: ১৮৫৯–৬০-এর নীলবিদ্রোহের পর ১৮৬০ সালে ব্রিটিশরা ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠন করে; কৃষকদের জোর করে নীল ফলাতে বাধ্য করা অন্যায়—এ কথা কমিশন স্বীকার করে এবং তার পরিণতিতে ব্যবস্থা বদলাতে থাকে। ফলে ১৮৬১–এর পর বাধ্যতামূলক নীলচাষ কার্যত বন্ধের পথে যায়।

জমিদার দর্পণ থেকে সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি (প্রসঙ্গ: জমিদারি-অত্যাচার)

মীর মশাররফের নাটক নীলচাষকে সরাসরি প্লট বানায়নি—এখানে লক্ষ্য জমিদারতন্ত্রের জুলুম ও প্রজার আর্তি। তবু একই সময়-প্রেক্ষিতে লেখা বলে নীলকারখানার জুলুমের সঙ্গে এর সামাজিক সুর মিশে যায়। নাটকের ভূমিকার কয়েকটি পঙক্তি:

“মরি নির্ধন প্রজার পরে অত্যাচার, কত জনে করে করে জমিদার।”

“প্রজা গেল গেল বলে জ্বলে জ্বলে মন।”

(উদ্ধৃতিগুলো নাটকের ‘ভূমিকা’ অংশ থেকে, শব্দ 그대로, সংক্ষিপ্ত আকারে দেওয়া হলো।)

কুষ্টিয়া–নদীয়ার “বিখ্যাত” নীলকুঠি ও কারখানা (তারিখ/লোকেশন ইঙ্গিতসহ)

স্থানীয় রাজস্ব-বন্দর কুমারখালীকে ঘিরে ১৮১৫-এর পর থেকেই নীলকারবারে জোয়ার আসে। বড় বড় কুঠির মধ্যে শালঘর-মধুয়া (কেনির কুঠি) ছাড়াও শিমুলিয়া, জঙ্গলিপাড়া, আমবাড়িয়া, দয়ারামপুর, শিলাইদহ, কালীগঞ্জ, জগন্নাথপুর, আর কুষ্টিয়া শহরের বেকিদালান কাচারি—এসবের উল্লেখ রয়েছে। নদীপথে (কালীগঙ্গা-কুমার-মাথাভাঙ্গা ধরে) কলকাতায় নীল পাঠানো হতো।

১৮৬১ সালের “পুরাতন কুষ্টিয়া”: নদীপথ ও নীলবাণিজ্যের পথঘাট

উনিশ শতকের মাঝামাঝি কুষ্টিয়া তখন অবিভক্ত নদীয়া জেলারই অংশ। বাণিজ্যের মেরুদণ্ড ছিল নদীপথ—পদ্মা থেকে শাখা গড়াই-কুমার-মাথাভাঙ্গা ধরে ভৈরব/ভাগীরথী-কলকাতা। কুমারখালীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট’-এর কার্যালয়, নীলের গুদাম ও কুঠিগুলো এই পথনির্ভর ছিল। ১৮৬০-এর কমিশন-রিপোর্টের পর ১৮৬১ থেকে বাধ্যতামূলক নীলচাষ স্তিমিত হয়ে নদীপথের সেই “নীল-ট্র্যাফিক”–ও কমতে থাকে।

রবি ঠাকুর, কুঠিবাড়ি, লালন ও কাঙাল হরিনাথ

ঠাকুরবাড়ির জমিদারি: রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ১৮০৭ সালে এ অঞ্চলের জমিদারি পান; রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯–১৯০১ শিলাইদহ কুঠিবাড়ি থেকে জমিদারি তত্ত্বাবধান করেন এবং বহু শ্রেষ্ঠ রচনা এখানে রচিত/সম্পাদিত হয়।

কাঙাল হরিনাথ (কুমারখালী): তাঁর গ্রামবার্তা প্রকাশিকা (১৮৬৩-) ঠিক এই কুষ্টিয়া-কুমারখালীর মাটিতেই নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবাদী লেখা ছাপায়—যা নীলবিদ্রোহের জনমত গড়ায় বড় ভূমিকা রাখে।

লালন ও রবীন্দ্রনাথ: শিলাইদহে থাকতেই রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহে মন দেন; ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রবাসী-তে লালনের ২০টি গান প্রথম মুদ্রিত হয়—সেখান থেকেই শিক্ষিত বাঙালির জগতে লালনের বিস্তার। (লালনের গান সরাসরি “নীলচাষ” নয়, কিন্তু শোষণ-বিরোধী মানবতাবাদী সুর নীলযন্ত্রণার সময়কার সমাজবাস্তবতাই প্রতিফলিত করে।)

প্রশাসনিক/ভূগোলের টীকা :

কুষ্টিয়া ১৯৪৭-এর আগে নদীয়া জেলারই একটি মহকুমা-অঞ্চল ছিল; দেশভাগে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর নিয়ে আলাদা জেলা গঠিত হয়। তাই “কুষ্টিয়া তথা পূর্বে নদীয়া”—এই পরিচয়টি ঐতিহাসিকভাবেই সঠিক।

মোটকথা, শালঘর-মধুয়া ছিল কুষ্টিয়া–নদীয়া নীলউৎপাদনের প্রধান কুঠিগুলোর একটি; এখানেই প্যারীসুন্দরীর নেতৃত্বে কৃষক-প্রজারা কেনির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তোলে (১৮৫৯–৬০)। সেই সময়ের সামন্ত-শোষণের ব্যথা মীর মশাররফের জমিদার দর্পণ-এ প্রতিধ্বনিত; আর কুষ্টিয়ারই কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথের পত্রিকা নীলকারখানার জুলুমের দলিল রেখে যায়। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান, লালনের গান সংগ্রহ-প্রকাশ—সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার ইতিহাসে নীলচাষ কেবল অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক স্মৃতিরও কেন্দ্রে।

ব্যবহৃত প্রধান সূত্র: কুমারখালী পৌরসভা ও কুষ্টিয়া জেলা পোর্টাল, বাংলাপিডিয়া, ইন্ডিগো রিভোল্ট সংক্রান্ত দলিল, বণিকবার্তা-র প্রতিবেদন, মীর মশাররফের রচনার সংকলন, এবং প্যারীসুন্দরী-বিষয়ক নিবন্ধ/জীবনী।

Sangbad Bela’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


মন্তব্য

Editor & Publisher: Md. Abdullah Al Mamun

Office: Airport haji camp

Phone: +8801712856310 Email: sangbadbela@gmail.com

Developed by RL IT BD